ছড়ার পোস্টমর্টেম

image_print

শাহ আলম বাদশা

ছড়া কী?
অভিধানমতে বা আভিধানিক অর্থে
১. গ্রাম্য ক্ষুদ্র পদ্যবিশেষ।
২. বিশেষধরণের ছন্দের ক্ষুদ্রাকার কবিতাবিশেষ।
৩. শিশুভোলানো বা মেয়েলী কবিতা।
৪. ছড়ি বা মালার আকারবিশিষ্ট বস্তু।
৫. গুচ্ছ।
৬. আঁচড়যুক্ত হওয়া।

ওপরের আভিধানিক ছয়টি গুণযুক্ত পদ্যই ছড়া। প্রায় দু’হাজার বছরের পুরনো মৌখিক পদ্যই এটি। অপ্রাসঙ্গিক হলেও এখানে ছড়া ও পদ্যের সামান্য ফারাকও তুলেধরবো যাতে অনেকের কৌতুহল মেটে।

১. গ্রাম্য ক্ষুদ্র পদ্যবিশেষ: শিক্ষিত-অশিক্ষিত গ্রাম্য মানুষের মুখে মুখে ছড়াকাটার ইতিহাস বহুপ্রাচীন। ছড়ার সৃষ্টি হয়েছে মুখে মুখেই এবং এভাবেই এটি যুগযুগ প্রচারিত হয়েছে একজন থেকে আরেকজনে। তাই হাজারো ছড়া হোক তা চলিতভাষায় বা আঞ্চলিক, আজ বাংলায় আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। কিন্তু মূললেখকের হদিস নেই। এসব ছড়ার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ক্ষুদ্রাকৃতি হওয়া। অর্থাৎ ছড়া মুখস্থযোগ্য স্বল্পদৈর্ঘ্য হতেই হবে।

২. বিশেধরণের ছন্দের ক্ষুদ্রাকার কবিতাবিশেষ: ছড়ার ছন্দ মানেই স্বরবৃত্ত, যাকে বিশেষধরণের ছন্দ বলা হয়েছে। এই ছন্দের বাইরে ছড়াসৃষ্টির আপাতত সুযোগ নেই। এখানেও বলা হয়েছে ক্ষুদ্রাকৃতিই ছড়ার একটা গুণ। কাজেই আবৃত্তি ও মুখস্থযোগ্য হবার দিকে খেয়াল রেখেই ছড়ার লাগামটানা জরুরি।

৩. শিশুভোলানো বা মেয়েলী কবিতা: ছড়ার জন্মই হয়েছে শিশুতোষ আকারে। মেয়েরা বা মা-বোনেরাই এর মূলভোক্তা। এরাই এর স্রষ্টা এবং আবৃত্তিকার। তাদের মুখে মুখেই ছড়াকাটার প্রচলন। পরবর্তীতে দু’পক্ষের মুখে মুখে ছড়াকাটা বা উত্তর-প্রত্যুত্তরের প্রতিযোগিতায় ছড়ার ব্যাপক ব্যবহার একে অতিজনপ্রিয় করে তোলে। মেয়েদের বিয়েসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে  ছড়াকাটা হতো এককভাবে বা সমস্বরে। পরবর্তীতে এর বদলে বিয়ের গানের প্রচলন হওয়ায় ছড়াকাটার প্রচলন সীমিত হয়ে যায়। আধুনিক যুগ এসে ছড়ার লেখ্যরূপ চলে আসায় ছড়াকাটারর ব্যাপকতা হারিয়ে যায়।

৪. ছড়ি বা মালার আকারবিশিষ্ট বস্তু: মালা যেমন একেকটি পুতি বা ফুলের পর আরেকটিকে পাশাপাশি সাজিয়ে তৈরি করা হয়, ছড়ার লাইনকেও সেভাবেই একের পর একটি চটুলশব্দ দিয়ে মালার মতন সাজিয়ে বানানো হয়। ছড়া যেন কথারই ছন্দময় এক মালাবিশেষ।

৫. গুচ্ছ: গুচ্ছ বা স্তবক হচ্ছে ফুলের পুষ্পার্ঘ্য। ছড়াও বিশেষ ছন্দকাঠামোয় গড়া একটি হৃদয়দোলানো পঙক্তি ও শব্দসমষ্টি। ফুলের গুচ্ছ বা স্তবকের ন্যায় সুন্দর ও ছন্দময়।

৬. আঁচড়যুক্ত হওয়া: শরীরে যেমন আঁচড় বা দাগ দৃশ্যমান হয়, ছড়াও আমাদের অন্তরে আঁচড়কাটে বা দাগা দেয়। দেখা নাগেলেও মনমাতানো ছন্দের দ্যোতনায় দেহমন নাচিয়ে দেয় ছড়া।

ছড় থেকে ছড়া:
ছড় অর্থ বেহালা, এসরাজ ইত্যাদি বাধ্যযন্ত্র বাজাবার জন্য ব্যবহৃত লম্বা সরু তারযুক্ত দণ্ডবিশেষ। বাজনার তাল, লয় বা ছন্দসৃষ্টির এই ছড় থেকে ছড়া নামটির উৎপত্তি। ছড়া তাই চটুলছন্দের আকর যা বাদ্যযন্ত্রের মতন সুরলহরী তোলে আমাদের নিরস-হৃদয়ে। কাজেই ছড়ার মতো কবিতা বা পদ্যের এতসব গুণ নেই, যা ছড়ার আছে। সাহিত্যের আদিশাখা তাই এই ছড়াই। ছড়া যার যতবেশি আয়ত্বে থাকে, সে ততবেশিই পারঙ্গম হয় কবিতা ও পদ্যে।

ছড়া ও পদ্যের মূলফারাক:
ছড়া মূলত স্বরবৃত্ত আর পদ্য সাধারণত মাত্রা বা অক্ষরবৃত্তের ধারক। ছড়া সর্বনিম্নতম মাত্রা ও পর্বে রচিত কিন্তু পদ্য তার থেকে বেশিতে রচিত। ছড়া চটুলছন্দে বা দ্রুতলয়ে রচিত কিন্তু পদ্য মধ্যম বা ধীরলয়ে হয়। ছড়া ও পদ্যের মূলফারাক হচ্ছে-ছড়া অর্থহীন বা ননসেন্স হতে পারে কিন্তু পদ্য ননসেন্স হয় না। ছড়ায় নাটকীয়তা, অস্পষ্টতা, হালকা উপমা থাকতে পারে কিন্তু পদ্য অজটিল এবং সোজাসাপ্টা ভাবসম্বলিত হয়। ছড়া ব্যাখ্যাসাপেক্ষ হতেই পারে কিন্তু পদ্যের বক্তব্য লেখক ও পাঠকের অবোধগম্য হবে না।

image_print

Be the first to comment on "ছড়ার পোস্টমর্টেম"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*


Pin It on Pinterest