বইমেলায় নারী লেখক নারী পাঠক

image_print

ওয়াইডনিউজ ডেস্ক: দিনটি ছিল শনিবার। আগে থেকেই জানা, বেলা ১১টা নাগাদ বইমেলার দ্বার খুলবে। তাই সকাল ১০টা বেজে ৩০ মিনিটে যখন শাহবাগ পৌঁছলাম, তখন থেকেই মাত্রাতিরিক্ত যানজট। হাঁটা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। যে যার মতো করে গন্তব্য স্থির করে এগোচ্ছেন। মেলায় প্রবেশদ্বারেও লাইনের বহর একবারে ছোট ছিল না। অনেক ঘাম ঝরিয়ে মেলায় প্রবেশমাত্রই মন ভালো হয়ে গেল। মনে হলো, কত জ্ঞানী-গুণী মানুষরা যেন আমাদের চার পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কেউ পুস্তকের মাঝে নিজেদের থাকা অভিজ্ঞতা ঢেলে অতীত হয়েছে। কেউ আছেন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে আশপাশেই। আর তাদেরকে ঘিরে পাঠকদের উপচে পড়া আবেগ। কেউ অটোগ্রাফ নিতে সদ্য কেনা লেখকের বই লেখকের সামনেই মেলে ধরেছেন, কেউ ব্যক্তিগত ডায়েরি, কাগজের পাতা ও হাতের তালু। ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে কখন যে ভিড়ের সমুদ্রে মিশে একাকার হয়ে গেছি অনুভবই হলো না। দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা ভুলিয়ে দেয় বই। তেমন বইয়ের সাম্রাজ্য মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও কঠিন তিক্ততা রাখে ভুলিয়ে। মানুষ সব অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতেই বুঝি আসে বইয়ের কাছে আশ্রয় নিতে। কথা হয় অনেকের সাথে।

তাদের মধ্য থেকে এ প্রসঙ্গেই লেখক আসমা চৌধুরী বলেন, এ নিয়ে আমার কোনো দ্বিমত নেই। একটি বইকে ঘিরে একজন লেখকের যেমন আবেগ, অভিজ্ঞতা ভালোবাসার সমন্বয় থাকে, তেমনি যারা পাঠক তাদেরও প্রিয় লেখককে ঘিরে আগ্রহের কমতি থাকে না। অবশেষে মেলায় এসে যখন প্রিয় লেখকের মুখোমুখি হয় তখন তারা আর নিজেদেরকে ধরে রাখতে পারেন না। কল্পনার মানুষটিকে ছুঁয়ে দেখতে চান। তার হাতের অক্ষর লিপিবদ্ধ করে রাখেন। সেলফি তুলে ধরে রাখেন বড় করে বাঁধিয়ে। হস্তাক্ষরের পাণ্ডুলিপি রাখেন সংরক্ষণে। আরো কত কী! আসমা চৌধুরীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম আপনার বেলায়ও কি এমনটি ঘটছে। উত্তরে তিনি বলেন, আমি তো স্বনামধন্য দামি কোনো লেখক নই। তবে হ্যাঁ, যাপিত জীবনে কেউ যদি লেখক পরিচিতি পান তখন তো একটু ব্যতিক্রম কিছু ঘটেই। সারা দিন কিভাবে কাটে, কখন লিখি, লেখার বিষয়বস্তু কিভাবে মাথায় আসে ইত্যাদি প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক অর্থেই করে থাকেন এবং একজন লেখক হিসেবে বিষয়টি উপভোগ করেন বলেও জানান লেখক আসমা চৌধুরী।

প্রকাশক মনোয়ারা বেগম বলেন, আমার প্রকাশনা সংস্থা নারী লেখকদের বই বেশি প্রকাশ করে থাকে। তিনি গোপনীয়তা রাখার অঙ্গীকারে আরো জানান। মেলায় ঘুরলে বুঝতে পারবেন নারীদের লেখা হাতেগোনা। বেশির ভাগ প্রকাশনা সংস্থা নারী লেখকদের বই ছাপাতেই চায় না। যদিও বা ছাপায় তার বেশির ভাগ চড়ামূল্য লেখককেই পরিশোধ করতে হয়। শুধু কি ছাপানো, প্রচার-প্রসার সব দিক দিয়েই বলতে গেলে নারী লেখকেরা আছেন পিছিয়ে। যতই আমরা শিক্ষিত আধুনিক নিজেদেরকে স্বাধীন বলে দাবি করি না কেন, এখনো আমাদের আছে অনেক প্রতিবন্ধকতা। একজন নারী লেখককে সেই প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়েই পেতে হয় স্বীকৃতি। এ স্বীকৃতি পেতেই অনেকের অর্ধেক জীবন কেটে যায়। আর প্রতিষ্ঠা, সে তো এক-তৃতীয়াংশের জন্য আকাশ-কুসুম স্বপ্ন হয়েই থেকে যায়। আমার জানা মতে, এমন অনেক নারী লেখক আছেন, যাদের লেখা কোনো দিন ছাপা অক্ষরেও প্রকাশ পায়নি; বই আকারে প্রকাশ তো পরের অধ্যায়। আবার এমনও অনেককে দেখেছি খুবই ভালো ডায়েরি লেখেন। লেখেন ভালো চিঠি ও শুভেচ্ছা কার্ড। কিন্তু পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে পারছেন না লেখক হওয়ার ন্যূনতম অনুপ্রেরণা। আত্মপ্রকাশ ঘটাতেও আজ অবধি পর্যন্ত পথে-ঘাটে প্রান্তরে আমাকে অনেক বেগ পেতে হয়েছে বলেও জানান প্রকাশক আসমা চৌধুরী।

কথা হয় পাঠক অনুর সাথে। অনু জানান, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্রী। থাকেন রোকেয়া হলে। যে কারণে সকাল-সন্ধ্যা দু’বেলা মেলায় আসতে তার কোনো সমস্যা হয় না। অনু আরো জানান, তিনি একটি প্রকাশনা সংস্থার হয়ে কাজ করছেন। বই বিক্রি, পরিচিতি প্রচারের পাশাপাশি সে সময় সুযোগ পেলেই নতুন প্রকাশিত বইগুলো পড়েন বলেও জানান। আপনার এই প্রকাশনা সংস্থা থেকে ক’জন নারী লেখকের বই বের হয়েছে জানতে চাইলে সাবরিনা বলেন, চার-পাঁচজন নারী লেখকের বই ছাপা হয়েছে। আশা করছি, বাকি দিনগুলোতে আরো আসবে। তবে পুরুষ লেখকদের তুলনামূলক কম। অথচ আপাতদৃষ্টিতে আগতদের মধ্যে নারী পাঠক-ক্রেতাই বেশি। যারা নারী লেখকদের বই বেশি চান। যেমনÑ আয়েশা ফয়েজের নতুন বই ‘শেষ চিঠি’। ইয়াসমীন হকের দু’টি নতুন বই। গুলতেকিন খানের নতুন বই ‘দূর দ্রাঘিমা’সহ আরো অনেক নারী লেখকের বই। অনু বলেন, ভালো পাঠক না হলে ভালো লেখক হওয়া অসম্ভব। যে কারণে অনেক স্বনামধন্য লেখককেও দেখেছি নতুন লেখকদের বই কিনতে। তাদের একনিষ্ঠ অনুপ্রেরণা দিতে অথবা লেখার আগ্রহ বাড়াতে বা নতুনেরা কী লিখছে জানতে। যা হোক, এ ডিজিটাল যুগে যখন কাউকে দেখি ব্যাগ ভরে বই কিনে বাড়ি ফিরতে, তখন মনে হয় আমরা ক্ষণিকের কৃত্রিমতা ভুলে প্রকৃত প্রেমের অধ্যায়ে ফিরে যাচ্ছি।

সুত্র: নয়া দিগন্ত

image_print

Be the first to comment on "বইমেলায় নারী লেখক নারী পাঠক"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*


Pin It on Pinterest