মন বাবুই

image_print

মির্জা নাহিদ হোসেন

মনের খাচাঁটাই এমন এক জায়গা যেখানে শূন্যতা ও পূর্ণতার বোধ একই সাথে হয়।এই রাত জাগা শহরের ইট-কাঠের পাজঁরে যে আনন্দ ও বেদনা লুকিয়ে আছে সেখানে কবিতা যেমন আছে, তেমনি কাব্যহীনতার প্রকটতাও কম নেই।

গত রাতে বাড়ীওয়ালা আমাকে অমায়িক হাসি দিয়ে বিদায় নোটিশ দিয়ে দিয়েছে।দোষ আমার না,আমার পকেটের।চার বছরের চৌকি,চৌকির তলার ইদু্ঁর,ঘরের কোনের মাকড়শা,মধ্য-দূপুরের অন্ধকার,স্যাতঁস্যাতে মেঝেও বুঝে গেছে আমি আর তাদের কেউ না।শূন্যতায় পূর্নতার খোজঁ তাদের।এ শহরে যখন এসেছিলাম,কেউ আমাকে নিতে আসেনি।যাবার বেলাও কেউ বিদায় দেবে সে আশা করাও বাতুলতা।

মাথায় কতো স্বপ্ন ছিল,স্বপ্ন গুলো এখনও আছে কিনা জানি না।খোজঁ নেওয়া হয়নি বহুদিন। ফজরের আজান দিচ্ছে।কেন জানি না এতো অভ্যাস পাল্টালেও এটা এখনো আছে।বাবার স্মৃতি না শৈশবের অভ্যাস? আমার মতো বিত্তবান রুমমেটরা এখনো ঘুমুচ্ছে।ওদের ঘুমের মাঝে হয়তো স্বপ্ন আছে।ভোর বেলার স্বপ্ন। স্বপ্ন পূরনের আজন্ম লালিত স্বপ্নিল স্বপ্ন।

ওদের স্বপ্নের মাঝে রেখেই নেমে পড়লাম রাস্তায়।সাথে এতো বেশী মালপত্র যে দু’হাতের তেমন দরকার নেই।কোথাও যাবো?  কার কাছে যাবো? এসব চিন্তা এখন আর করি না।পথে নামলে পথই পথ  দেখাবে।ভোরের অন্ধকার এতো দ্রুত কেটে যায়!

ঢাকা শহর ঘুমায় চারটে থেকে সাতটা পর্যন্ত। কোন দোকানপাট, মানুষ আছে বলে মনে হয় না।কিছু নামাজি মানুষ ছাড়া আশে পাশে পিনপতন নিরবতা।কুয়াশার গান,গলির  মহিলাদের কোরাস ভৈরবী  ছাড়া আর কোন শব্দ নেই।উর্দু রোডের যেখানে থাকি, সেখানে স্বাস্থ্য সচেতন লোক নেই।এ বিলাসিতার সুযোগ ও হয় না বোধ হয়।খুব ইচ্ছা করছিল এককাপ চা আর একটা সিগারেট খেতে।দোকান-পাট সব বন্ধ। হাতের ব্যাগে একটা সিগারেট থাকার কথা।ম্যাচ কি আছে?

পিনপতন নীরবতার মাঝে হঠাৎ  কোথা থেকে হাজির পুলিশের গাড়ী।হ্যাঁ, আমাকেই ডাকছে।আমার অবাক হওয়ার কথা।অবাক হলাম না বলে- নিজেই অবাক হলাম।নাকি অবাক হবার বোধটাই হারিয়ে ফেলেছি? কবে?কখন?কোথায়?

তাছাড়া পুলিশ তো রাত বারোটা থেকে ভোর চারটে পর্যন্ত টহল দেওয়াটা নিয়মে পরিনত করেছে।এখন কয়টা বাজে?

মোবাইল টা ৭০০ টাকায় বেচে না দিলে সময় টা দেখা যেতো।এ ভাবনার সময় কতোটুকু বোঝার আগেই দেখি হাতে হাতকড়া।

তাকিয়ে দেখি এসআই মফিজের এর মুখে চাপা হাসি।অনেকটা কোষ্ঠকাঠিন্য রোগীর বড়টা সারার পরের তৃপ্তির মতো। টাকার অভাবে আমার না কামানো দাড়িঁ, গোফঁ, চুল ওনার বড় পছন্দ! নাকি মেসে আমায় না পেয়ে এখানে আমায় দেখে ঈদের চাঁদ হাতে পেলেন?

আমাকে কিছুই করতে হলো না।লাঠির ঠেলায় উঠে পড়লাম গাড়ীতে।হাতে হ্যান্ডক্যাপ থাকায় আমার  চুল গুলো উনাদের আমাকে গাড়ীতে তুলতে সাহায্য করলো,আমি নিজেকে ধন্য মনে করলাম এটুকু সাহায্য করতে পারায়।

ভোরের তাজা হাওয়ায় এতো দামী গাড়ীতে চড়তে এতো আরাম জানতাম না।অনন্তকাল চড়তে পারলে বেশ হতো।নিজেকে কেন যেন নায়ক নায়ক মনে হচ্ছে।আমার কাছে টাকা নেই এটা বড় লজ্জার কথা।পুলিশের গাড়ী ভাড়া কতো জানতে পারলে হতো।পকেটের একশো একুশ  টাকায় কি হবে? আমার পোটলাটা কোথায়? ওখানে দু’একটা বই আছে।ওরা কি ওগুলো নেবে?

তখন আর বয়স কতো হবে   চৌদ্দ বা পনেরো ।দারুণ স্বপ্নময় সময়।সময়ের আচঁলে স্বপ্নদের ওড়াওড়ি। আর সে স্বপ্নে প্রথম প্রেম।জগতের প্রতিটা মেয়েকেই মোহনীয় ও নিজের মনে হওয়ার বয়স।তবুও কেউ আমার না,যদিও স্বপ্নে একেকদিন একেকজনের আনাগোনা।

লজ্জা মেয়েদের নয় কিশোর ছেলেদের ভূষণ, যদি সে নিপাট নিম্ন মধ্যবিত্ত হয়।ভুলে ভালো রেজাল্ট করায় বিনা পয়সায় সুযোগ মিলে যায় গ্রামের কলেজে।ভালো জামা, কাপড়, খাবারের প্রতি লোভ ছিল না বললে মিথ্যা বলা হবে তবুও কিভাবে জানি শিখে ফেলেছিলাম ওগুলো আর যাই হোক আমার জন্য না।

যতই বিনা মূল্যের হোক তবুও খাতা,কলম,পুরনো বই পত্র কিনতেও টাকা লাগে।এর ওর বাসায় পড়িয়ে মাসে দু’হাজার আয় হতো।মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছা করতো চটপটি বা কাবাব খেতে।অযথা পয়সা নস্ট ভেবে কোনদিন খাওয়া হয়নি।পিতা কি জিনিস জানি না।মা যদিও বা আছেন তবে মমতার চেয়ে বেশী অসুস্থতা নিয়ে।সে সময় বুঝে গিয়েছিলাম মেয়েরা সহজে মরে না।বিরাট আদর্শ নিয়ে থাকলে সুন্দরীদের যা হয় তার সবই ছিল মায়ের মধ্যে।মা মানসিক রোগী ছিলেন বুঝি নি।যখন বুঝলাম দেখি খড়ি কাঠের সাথে মা দোল খাচ্ছেন আর আমি ভাবছি কি সুন্দর দোলনা মায়ের! কেন কান্না আসে নি? নাকি এ বয়সে এতো কেঁদেছি  যে নতুন কোন কান্না আসতে নেই!

পাশের বাড়ীর হাজী লুলু  চাচা আর উনার মসজিদের হুজুর তো জানাজা পড়াতেই দেবেন না। লুলু চাচার বাবা টুনু খোড়াঁ পিস কমিটির চেয়ারম্যান হলেও উনি এখন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধার সন্তান।উনার অনেক দয়া,সবার অনুরোধের বিনিময়ে বসত ভিটাটা নিয়ে নিলেন।বিনিময়ে জানাজা আর হুজুরদের খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন।

তখন থেকে সারা পৃথিবী আমার ঘর।আকাশ আমার ছাদ।আমার ছাদটা কতো বড় আর কতো রঙ  রাঙ্গানো! এরপরে পেটের টানে বেচেঁ দিলাম আমার শত রঙ এ রাঙ্গানো বিশাল ছাদটাও।

সারাদিন রাত ধরে চলতো আধাঁরে প্রুফ দেখা।কতো রকম মানুষের কতোরকম ভনিতা।একুশে বই মেলার আগের তিনমাস চলতো অবিরাম খাটুনি।অবসরে দু’এক পাতা লিখেও ফেলতাম কখনো কখনো।ছাপাখানাটা তারচেয়েও ছোট মনের মালিকের সাথে দিব্যি মানিয়ে যেত।এটি ছিল তিনজনের বাসা কাম অফিস।রাতে মশাদের গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যেতাম।যেদিন ঘুম আসতো না সেদিন কল্পনার ফানুস উড়াতাম।

দু’একজন বাদে লেখক বাদে বেশীরভাগ বই চলতো আমলাদের।এসব অখাদ্য বই এতো কিভাবে বিক্রি হতো আমার মাথায় আসতো না।কতো ভালো কবি ও কবিতার বই পরে থাকতো!

মালিক একদিন আমাকে আমাকে অন্য মালিকের হাতে তুলে দিয়ে চলে গেলেন নিজ মালিকের কাছে।হয়তো আকাশের তারা হতে চেয়েছিলেন।এতো তারার মাঝে কি তারা হতে পেরেছিলেন? অনেক তারাদের মেলায় তাকে দেখিনি কখনো।একরাশ আধাঁরের মেলায় হয়তো আধাঁরে মিশে গেছেন।

হঠাৎ দুনিয়ার সব আলো এসে চোখে লাগলো।এতো আলোর ঝলকানী আগে কোথায় দেখেছি? হাত দিয়ে চোখ ঢাকতেও ইচ্ছা করছিল না।ইচ্ছা করলেও পারতাম না।হাতের হ্যান্ডক্যাপ তখনও হাতে।

সাংবাদিক ভাইদের আলোকময় ক্যামেরাই আমাকে দেখতে কেমন লাগছিল; জানতে ইচ্ছা হচ্ছিল খুব।আমি এতো বিখ্যাত কখনো জানতাম না।পুলিশ ভাইয়েরা আমার সামনে, পেছনে দাড়াঁনো নিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগীতায় ব্যস্ত।কে জেনো বলে উঠলো কার আম কার ছালায়।মিনিস্টার সাহেবের ছেলে এবারও বেচেঁ গেলেন। কে বললো? কেন?

এসময়   মিনিস্টার সাহেবের দেখাও পেয়ে গেলাম। কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে! হঠাৎ মনে পড়লো আরে ইনিই তো আমার সেই এনায়েত ওরফে লুলু চাচা।চেহারা আরো চেকনায় হয়েছে।উনি অনর্গল ক্যামেরার সামনে বলে যাচ্ছেন কি কষ্ট ই না করেছেন উনার দপ্তরের কর্তা ব্যক্তিরা।আচ্ছা উনার বড় মেয়ে কি ফিরে এসেছিল? নাকি ভেটে পাঠানো মেয়েরা আর ফেরেনা?উনার বখে যাওয়া ছেলেটা কেমন আছে?

দেশ বিদেশে আলোচিত এই আমার দিকে ফিরেও তাকানোর সময় পান নি।খুব ইচ্ছা হচ্ছিল কাছে পেলে একদলা থুতু দিতে। সব ইচ্ছা পূরণ হতে নেই।

আকাশে একটি উড়োজাহাজ।সেখানে কি আমার মতো কেও আছে?  আবার আধাঁর।এবার চোখে একটুকরো কালো কাপড়।চলতে চলতে হঠাৎ গাড়ীটা থেমে গেলো।তেল শেষ নাকি? এ গাড়ীটায় চড়ে তেমন আরাম নেই।এতো ঝাঁকুনি! একি মা এখানে এলেন কি করে! হঠাৎ এক ঝাঁক বিকট শব্দে দেখি আমি আমার   মায়ের কোলে।মা হাসতে হাসতে বললেন, বোকা ছেলে এতো অসভ্য লোকদের সাথে তুই কেন?

আয় বাজান আমার কোলে আয়।

image_print

Be the first to comment on "মন বাবুই"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*


Pin It on Pinterest